মঙ্গলবার,১৯ জুলাই ২০১৬
সিটিজিবার্তা২৪ডটকম
আমি উনিশ শত ছিয়ানব্বই/ সাতানব্বই শিক্ষাশর্ষে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স করতে পাকিস্তানের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ ( বর্তমানে ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি) ইসলামাবাদে যাই। ইসলামাবাদের মারগালা পাহাড়ের পাদদেশে মুঘল স্থাপত্যের আদলে নির্মিত পাকিস্তান ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের বিশাল ইমারত স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে তার রাজকীয় উপস্হিতীর জানান দিচ্ছে। সুন্দর মনোরম পরিবেশে শিক্ষার এমন অকল্পনীয় সুচারু ব্যবস্থা এখানে না এলে বুঝা যায় না। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরী বই পুস্তক, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীর উপরে লেখা উচ্চমানের ম্যাগাজিন, বিভিন্ন বিষয়ের উপরে লেখা আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন, পিরিওডিক্যালস , আন্তর্জাতিক মানের প্রায় সব খবরের কাগজ এবং পুস্তিকায় ঠাসা ও সমৃদ্ধ অতি উচ্চমানের এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে প্রবেশ করলে এর শেষ যেন খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি যতবার এই লাইব্রেরীতে গেছি পড়াশোনা করতে করতে কখনযে রাত দশটা বেজে লাইব্রেরী অওয়ার শেষ হয়েছে বুঝতে পারিনি। ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্সে পড়াশোনার পাশাপাশি ভিজিট, সোসালাইজিং , আন্তর্জাতিক মানের স্কলারদের বিভিন্ন চলমান বিশ্ব পরিস্থিতির উপরে লেকচারে অংশ গ্রহন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ এবং বিশ্বমানের রিসার্চ ও এনালিসিসে বিশ্বের চলমান সমস্যার উপরে ব্রেইন স্টর্মিং করে পেপার তৈরী করে তা সেমিনার হলে উপস্থাপন করা এবং প্রশ্ন উওরে অংশ গ্রহন, এন্টিসিপেটেড পরিস্থিতির উপরে ওয়ার গেমিং, ওপেন এয়ার এবং পাঁচতারকা হোটেলে পার্টিতে অংশ গ্রহন ছিল নিত্যদিনের কমিটমেন্ট । তদুপরি ড্রেসকোডের ব্যপারে কোনো প্রকার কম্প্রোমাইজের স্কোপ ছিলনা। সাধারণত ওপেন এয়ার পার্টিতে আমরা স্টুডেন্ট অফিসাররা ফেমিলিসহ অংশ নিতাম। কারণ এইসব ওপেন এয়ার পার্টিগুলো ইনফর্মাল হতো। তো এমনি এক ওপেন এয়ার পার্টিতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ যনি একজন পাঠান তিনি আমাদের সাথে তাঁর স্ত্রীর পরিচয় করিয়ে দেবার সময় বললেন তাঁর স্ত্রী ঢাকার নবাব পরিবারের মেয়ে পেশায় ডাক্তার । আমি আশ্চর্য হয়ে ওনাকে দেখছিলাম এবং ভাবছিলাম তিনি দেখতে ঠিক বেগম খালেদা জিয়ার মতো । তফাৎ কেবল ওনার গায়ের রং একটু চাপা এবং বয়ষ বেগম খালেদা জিয়ার চেয়ে কিছু কম। মনটা খারাপ হলো তিনি আমাদের সাথে উর্দুতে কথা বললেন এবং মনে হলো তিনি একটু তফাৎে থাকতে চান। তবে ব্রিগেডিয়ার খিলেদের সাথে আমার হৃদ্যতা নিন দিন বৃদ্ধি পেয়েছিলো কমেনি ।
একদিন ক্লাস ব্রেকের সময় ব্রিগেডিয়ার খালেদসহ বেশ কয়জন ক্লাসমেট আমরা খোশ গল্প করছি। ব্রিগেডিয়ার খালেদ গল্পচ্ছলে তাঁর গ্রামের এক অভূতপূর্ব গল্প আমাদেরকে শুনালো। গল্পটা হলো উনিশ শত উনষাট সালের কথা। তখন বিশ্বে আলোড়নকারী ঘটনা এপোলো এগারো চাঁদে অবতরন করেছে ঐবছরের বিশে জুলাই রাত আটটা আঠারো মিনিটে।চাঁদে অবতরণকারী প্রথম ব্যক্তি নীল আর্মস্ট্রং এবং আর্মস্ট্রং এর ছয় ঘন্টা পরে চাঁদে অবতরণ করেন বাজ অলড্রিন। তো ব্রিগেডিয়ার খালেদ পরিবার নিয়ে গ্রামে বেড়াতে গেছেন। আপনারা হয়তো জানেন পাঠানদের প্রতিটি গ্রামে একটি করে জিরগা বা মুরুব্বীদের পর্ষদ আছে যারা গ্রামের যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা করে । ব্রিগেডিয়ার খালেদ গ্রামে গিয়ে জানতে পারলেন যে তাঁর গ্রামের জিরগা প্রধান আদেশ জারি করেছে যে চাঁদনীরাতে কোনো মহিলা বেপর্দা বাড়ীর বাইরে যেতে পারবেনা। কারণ চাঁদে মানুষ পৌছে গেছে। জিরগা প্রধানের ধারনা যেহেতু চাঁদে মানুষ পৌছে গেছে তাই জ্যোৎস্না রাতে কোনো মহিলা বেপর্দা ঘরের বাইরে গেলে চাঁদ থেকে মানুষ তাদের দেখে ফেলবে। আমি ব্রিগেডিয়ার খালেদকে বললাম আপনি জিরগা প্রধানের সাথে দেখা করে তাঁকে বুঝিয়ে বললেননা কেন যে এটা একটা ভূল ধারনা। চাঁদে মানুষ অবতরণ করেছে এবং দুনিয়াতে ফিরেও এসেছে। তাছাড়া চাঁদ থেকেতো দুনিয়ার মানুষকে দেখা সম্ভবনা । ব্রিগেডিয়ার খালেদ বললেন আমি জিরগা প্রধানের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত নাকামিয়াব হয়ে ফিরে এসেছি। জিরগা প্রধান নাকি ব্রিগেডিয়ার খালেদের উপরে রাগ করে বলেছে তুমি কিছু জাননা।
এইরকমই আর একটি গল্প আমাকে শুনিয়েছিলেন আমার শশুরের বন্ধু পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির বাসিন্দা জনাব শাহ মোহাম্মদ গোলাম নবী ( বর্তমানে মৃত )। জনাব শাহ মোহাম্মদ গোলাম নবী কাশ্মীরের মানুষ । স্বস্ত্রীক দিনাজপুরে সেটেল করেন পঞ্চাশের দশকে এবং আমার শশুরের ব্যাবসায়ীক পার্টনার হন। জনাব শাহ মোহাম্মদ গোলাম নবীর সব সন্তানের জন্ম দিনাজপুরে হয়। তিনি নিজে এবং পরিবারের সবাই বাংলাতে কথা বলেন। একাওর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান পরিবারসহ এবং রাওয়ালপিন্ডিতে স্হীত হন । আমি প্রতি বৃহস্পতিবার রাওয়ালপিন্ডিতে ওনার বাসাতে গিয়ে সময় কাটাতাম। তো একদিন শাহ মোহাম্মদ গোলাম নবী সাহেব তবলীগ জামাতের এক গল্প শোনালেন। গল্পটা হলো একটি তবলীগের জামাত বেলুচিস্তানে তবলীগ করতে গেছে। অনেক লোকের সমাগম হয়েছে। তবলীগের মুরুব্বীদের লেকচার শেষ হয়েছে। শেষে তবলীগ জামাতের এক মুরুব্বী জানতে চাইলেন উপস্হিত সবার কাছে আমরা যাযা বললাম যেমন আল্লাহ এক, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নাই, হযরত মুহাম্মদী( ( সা : ) আল্লাহর শেষ নবী ও রাসূল এটা আপনারা বুঝতে পেরেছেন? তো শ্রতাদের মধ্য থেকে কয়জন দাঁড়িয়ে বললো আমরা ফিরে গিয়ে আমাদের কবিলার সর্দারকে আপনাদের সব কথা বলবো যাযা আপনারা আমাদেরকে বিশ্বাস করতে বলেছেন । যদি আমাদের কবিলার সর্দার আমাদেরকে আপনাদের সব কথা বিশ্বাস করতে বলেন তবে আপনারা যাযা বলেছেন তাসব আমরা বিশ্বাস করবো। আর যদি আমাদের কবালার সর্দার বিশ্বাস করতে মানা করে তাহলে আমরা আপনাদের কোনো কথাই বিশ্বাস করবোনা। এই বলে সবাই চলে গেল। এই হলো পাকিস্তানের পাঠানদের বুদ্ধি বিকলাঙ্গতার অবস্থা!
তো আজকে আপনাদের সামনে আমার নিজের অভিজ্ঞতার এই দুই সত্যি ঘটনার অবতারণা করলাম এই কারণে যে পাকিস্তানের বুদ্ধি বিকলাঙ্গ পাঠানদের মতো অনেক বুদ্ধি বিকলাঙ্গ ইদানীং বাংলাদেশেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। পাকিস্তানের বুদ্ধি বিকলাঙ্গ পাঠানরা যেমন গ্রামের জিরগা প্রধানের মতো অসম্ভব বিকলাঙ্গ চিন্তা করে কিংবা তাদের কবিলার সর্দারের কথার বাইরে সত্য মিথ্যার ভেদবিচার করতে পারেনা তেমনি বাংলাদেশের বিজ্ঞানমনষ্ক মুক্তবুদ্ধির কিছু বুদ্ধিবিকলাঙ্গ বিজ্ঞানের দেখানো পথের বাইরে সত্য মিথ্যারও ভেদবিচার করতে পারেনা। এরা বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত সত্যকেই কেবল সত্যি জ্ঞান করে। যদিও আমরা জানি বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নিজের ভূল সংশোধন, পরিবর্তন, পরিমার্জন এবং পরিবর্ধন করছে অব্যাহতভাবে। আজ থেকে হাজার বছর আগে বিজ্ঞান যাকে সত্যি বলেছিলো আজ বিজ্ঞান নিজে তার অবস্হান পরিবর্তন করে তাকে ভূল বলছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা?
মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমান ।
প্রাক্তন মহাপরিচালক বিডিআর ।



You must log in to post a comment.