রনিয়া রহিম: আমার বাবা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষকে সাহায্য করেছেন; বিশেষ করে কাউকে সার্বিক, সুষ্ঠ পরামর্শ দেয়ার বেলাতে আব্বুর বেশ সুনাম আছে। চাকরি কি করে পাওয়া যায়, কোথায় এপ্লাই করতে হবে আর কি করে, ইন্টারভিউতে কি বললে ভালো আর কি ভালো না, এরকম কাউন্সেলিং আব্বু বহুবারই বহুজনকে দিয়েছেন।
সেরকম চাকরি-প্রত্যাশী একজন একবার আমার বাবার কাছে এসে অভিযোগ করলেন, এদেশের ইসলাম-বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে তাঁর কোথাও কখনো চাকরি হয়না, সবই ‘তাদের’ দোষ! আমি খুব অবাক চোখে তাঁর দিকে তাকালাম, – কেবলমাত্র তাঁর পার্সোনালিটি যদি কোন মাপকাঠি হয়, তাহলে আমিও তাঁকে চাকরি দিতাম না। সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তিনি, আর সত্যি কথা, এদেশে এমন প্রচুর আছে। কেবল মাত্র কারো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর স্কিলসেট দেখে চাকরিতে নেয় না এখন কেউ। সার্বিক ব্যক্তিত্বকে মাথায় রাখা হয়। এই মানুষটার পোশাকে কোন স্মার্টনেস নেই, বিন্দুমাত্র প্রফেশনালিজম নেই, কিন্তু তিনি নিজেকে পাল্টাতে নারাজ। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে তিনি দাড়ি রাখেন, আর আমার শ্রদ্ধা আছে তাঁর বিশ্বাসের প্রতি; কিন্তু বিন্দুমাত্র গ্রূমিং নেই কোন; সে দাড়ি দেখে তাঁর বিশ্বাসের উপর শ্রদ্ধা জন্মাবার চাইতে বরং মনে হবে, এই মানুষটা এইভাবে বাসার বাইরে এসেছেন কেন, বের হওয়ার আগে আয়নায় তাকালেন না কেন? আর তিনি যেভাবে নালিশ করে যাচ্ছেন, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে আত্মসমালোচনা কি আত্ম-পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত করেন না তিনি কোনদিন, সব দোষ কেবল অন্যের, নিজের না কখনো; – এই মনোভাব যদি ইন্টারভিউতেও ফুটে উঠে থাকে (আর এইধরণের জিনিস লুকোনো যায় না), তাহলে আমি কেন বস হিসেবে এইরকম কর্মচারী চাইবো আমার অফিসে?
এই লোকটাকে কে বোঝাবে সেটা? তাঁর মাথায় ঢুকে আছে, “আমি মুসলিম, আর সবাই আমার শত্রু!”
আপনি মুসলিম, আর সবাই আপনার শত্রু, এই মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসুন।
প্যালেস্টাইনকে তো মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বড় মনভাঙ্গা সমস্যা বলে ধরা হয়, তাই তো? অবশ্যই প্যালেস্টাইনের মানুষগুলো নিদারুণ দুঃস্বপ্নে থাকে, কিন্তু তাঁদের জন্য কষ্ট পান মানুষ হিসেবে, কেবল মাত্র মুসলিম হিসেবে পাচ্ছেন কেন? ধর্ম-রাজনীতি সেখানে হয় আমি অস্বীকার করবো না, কিন্তু ধর্ম না থাকলেও কি রাজনীতি হতো না? মূল কথা কি রাজনীতি’টাই হচ্ছে না? তাই স্পষ্ট বলুন ইজরাইলি সরকার নিপীড়ক, তাদেরকে যারা সমর্থন দিচ্ছে,সেটা অন্যায় হচ্ছে, নিরীহ মানুষের উপর নিপীড়ন হচ্ছে, এইগুলো বলুন। …… কিন্তু সারা বিশ্ব মুসলমানদের পেছনে লেগে আছে, এইসব কি অহেতুক কথাবার্তা!? এইরকম ‘হায় হায়’ কথাবার্তা বলে নিজেকে ভিকটিম হিসেবে ছোট করে রেখে নিজের নিয়ন্ত্রণ আর কারো হাতে তুলে দিচ্ছেন কেন?
এই মনোভাবটা আগে হয়তো কেবল বিরক্তিকর ছিলো, কিন্তু এখন তো রীতিমত ক্ষতিকর। “আমরা মুসলিম আর সবাই আমাদের শত্রু”, এই কথা বলে বলে জঙ্গিরা যে ‘সাধারণ’ মুসলমানদের মগজধোলাই করে জঙ্গি সৃষ্টি করছে, আর তারা যে ‘ইসলামের শত্রু’দের উপর ‘জিহাদ’ ঘোষণা করে বাকিদের উপর তলোয়ার থেকে ট্রাক, সব উঠিয়ে দিচ্ছে, সেটা কি আপনার চোখে পড়ছে না?? – খুব জানি, এইরকম জঙ্গিবাদী হামলা হলে আপনার চাইতে কষ্ট আর কেউ পায় না, আপনার কাছে মনে হয় আপনার ধর্ম শান্তি ধর্ম, এরা সন্ত্রাসী কেবল, মুসলিম মোটেও না! আমি আপনার এই মনোভাবকে স্বাগত জানাই, আর শ্রদ্ধা জানাই; – কিন্তু আপনি যদি জঙ্গিদেরকে থামাতে চান, তাহলে এই ‘শত্রু শত্রু খেলা’টাও এখন থেকেই থামান। ঠিক এই মুহূর্ত থেকে!
– আজকে আপনি এটা মন খারাপ করে বলছেন, ফেসবুকে লিখছেন। আপনার ছোট ভাইটা প্রতিনিয়ত শুনছে, সে নিজেও ফেসবুকে ঢুকে এইসব লেখা দেখছে, আরো কিছু ভিকটিম-ভাবনার পেইজ ফলো করে ফেলছে, আরো কিছু খবর দেখছে যা দেখে ওর মনে হচ্ছে, আরেহ, তাই তো! এইসব মুসলমানদের বাঁচাতে হবে! মুসলিম-বিশ্বটাকে রক্ষা করতে হবে!! তারপর কোন এক জঙ্গিবাদী একদিন তার সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেললো, তার এই ভাবনাগুলো উস্কে দিলো, একদিন আপনার ভাই ঘরছাড়া হলো, চার মাস পরে টিভি পর্দায় দেখলেন, জঙ্গিবাদী হামলা চালাতে গিয়ে সে নিহত; – তখন?
অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই বলবেন। আপনি যখন যে অসঙ্গতি দেখছেন, বলুন। কিন্তু বলবেন দায়িত্বশীলতার সাথে। আর বলবেন, ঢালাওভাবে না, নির্দিষ্ট অন্যায়ের সুস্পষ্ট প্রতিবাদ করুন, কন্সপিরেসি থিওরির গায়ে হেলান দিয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন রণংদেহী কথাবার্তা মোটেই নয়!
আর মুসলিম বিশ্বকে উদ্ধার করতে চান? জিহাদই ঘোষণা করুন! জিহাদ -যুদ্ধ- আত্মউন্নয়নের যে যুদ্ধ, যার কথা মহানবী (সাঃ) বলে গেছেন, “মূল যুদ্ধ, আমাদের আত্মার সাথে” [আল-মাজলিসী, হাদিস # ৩১, ইমাম জাফর আল-সাদিকের বয়ানে]। ফেসবুকে আর চায়ের আড্ডায় আপামর দুনিয়ার বিরুদ্ধে অপবাদ না দিয়ে বরং মনে রাখুন, “সত্যি সফল সে’ই, যে আত্মশুদ্ধিতে নিয়োজিত থাকে” (সূরা ৯১: আয়াত ৯)।
রনিয়া রহিম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার গঠনমূলক এবং সুখপাঠ্য লেখার জন্য সুপরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্প সংগ্রহ এবং সংরক্ষনে তার নেয়া উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।



You must log in to post a comment.